ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ১০টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর দেশে-বিদেশে থাকা প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। অর্থপাচার রোধ ও পাচার হওয়া টাকা ফেরাতে গঠিত বিশেষ আন্তঃসংস্থা দলের সুপারিশে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) একাধিক সংস্থা এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সংসদ সদস্যের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান চিত্র ও সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, ঋণ জালিয়াতি, অর্থপাচার এবং প্রভাবশালী মহলের অনিয়ম নিয়ে সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহা. রবিউল বাশারের করা প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দের তথ্য প্রকাশ করেন।
সংসদে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ দলের নির্দেশনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাচারকারী ও দুর্নীতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে দুদকের নেতৃত্বে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল কাজ করছে। এই তদন্তের ভিত্তিতে গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে দেশের ভেতরে ৯ হাজার ৯১৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি (জমি, ফ্ল্যাট বা ভবন) সংযুক্ত এবং ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৩ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি (ব্যাংক হিসাব, শেয়ার বা নগদ অর্থ) অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
একইভাবে দেশের বাইরেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানান, বিদেশে পাচার করা ১৫ হাজার ১১১ কোটি ৯২ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি এবং ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে ও বিদেশে জব্দ হওয়া সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা।
বিদেশে থাকা এই বিপুল সম্পদ পুরোপুরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ইতোমধ্যে ১৩টি ‘পারস্পরিক আইনি সহায়তা অনুরোধ’ পাঠানো হয়েছে এবং আরও ১২টি পাঠানোর কাজ চলছে। অর্থপাচারের মূল গন্তব্য হিসেবে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড এবং হংকং-চীনকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত আইনি সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মতি জানিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ড বিকল্প ব্যবস্থায় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
অর্থপাচার রোধে এবং পাচার হওয়া সম্পদ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের অধীনে ‘পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার বিভাগ’ নামে নতুন একটি সেল গঠন করা হয়েছে। তবে এই অবরুদ্ধ হওয়া ৭৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ঠিক কত টাকা ইতিমধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে বা বড় খেলাপিদের কাছ থেকে আদায়ের পরিমাণ কত, সে বিষয়ে সংসদে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, অর্থপাচার সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনায় এ পর্যন্ত ১৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলার অভিযোগপত্র জমা পড়েছে এবং ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। দুদকের পাশাপাশি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করছে।
এদিকে, রুগ্ন ব্যাংকিং খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণের আদায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই নতুন আইনে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হলে আমানতকারীরা আগের এক লাখ টাকার পরিবর্তে এখন সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন। অর্থ ফেরতের অপেক্ষার সময়সীমাও ১৮০ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ১৭ দিন করা হয়েছে।
৭৬ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ অবরুদ্ধ করার এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, বিগত সময়ে দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের অবাধ লুণ্ঠন চলেছে। সম্পদ জব্দের এই প্রাথমিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, এই অবরুদ্ধ সম্পদ কবে নাগাদ পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে? পাচার হওয়া অর্থ বিদেশি আইনি কাঠামোর জটিলতা পেরিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। শুধু ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ বা মামলা করাই শেষ কথা নয়; বরং শক্ত কূটনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে কাজে লাগানোই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।