মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠা অনাগত শিশুর লিঙ্গ পরিচয় আগে থেকে নির্ধারণ ও তা প্রকাশ করাকে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছেন দেশের উচ্চ আদালত। কন্যাভ্রূণ হত্যা রোধ ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় এই যুগান্তকারী রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে দেশের সব রোগ নির্ণয় কেন্দ্রকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মাতৃত্ব যেকোনো নারীর জন্যই চরম আরাধ্য ও আবেগের এক পবিত্র বিষয়। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই মায়ের গর্ভে থাকা অনাগত সন্তানের লিঙ্গ নিয়ে এক ধরনের নেতিবাচক ও অযাচিত কৌতূহল দেখা যায়। বিশেষ করে পুত্রসন্তানের আশায় কন্যাভ্রূণ নষ্ট করার মতো চরম অমানবিক ঘটনাও হরহামেশাই ঘটে থাকে। এমন ঘৃণ্য চর্চা ও জঘন্য অপরাধ রুখতে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বাংলাদেশের উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট)। ভ্রূণের লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণ ও তা প্রকাশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন আদালত।
বিচারপতি নাইমা হায়দার এবং বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চ আদালতের একটি দ্বৈত বেঞ্চ চলতি বছরের পঁচিশে ফেব্রুয়ারি এই অতি গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেছিলেন। সোমবার (১১ মে) সেই রায়েরই পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত এই রায়ে আদালত সমাজের এক গভীর ও নীরব ক্ষতকে তুলে ধরেছেন এবং তা নিরাময়ে সরকারের প্রতি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেছেন, অনাগত শিশুর লিঙ্গ পরিচয় আগে থেকে চিকিৎসকের মাধ্যমে নির্ধারণ করা এবং তা মা-বাবা বা স্বজনদের কাছে প্রকাশ করা সরাসরি নারীর প্রতি চরম বৈষম্যের শামিল। এ ধরনের অনৈতিক চর্চা সমাজে কন্যাশিশু হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়, যা একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি। এটি সামাজিক ভারসাম্যহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ বলেও উল্লেখ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে বিচারকেরা আরও স্পষ্ট করেছেন যে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্বাধীন বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। মানুষের মর্যাদা, নারী-পুরুষের সমতা এবং নিরাপদে বেঁচে থাকার যে মৌলিক অধিকার সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়েছে, ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ সেই অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। এটি শুধু দেশীয় আইনেই নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ডেও একটি অতি গুরুতর অপরাধ।
আমাদের দেশে গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষার নামে যত্রতত্র অলিগলিতে গড়ে ওঠা চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে লিঙ্গ নির্ধারণ করা হলেও এর কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি ছিল না। এই বিষয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে আদালত বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে এ সংক্রান্ত কার্যকর নজরদারির চরম অনুপস্থিতি রয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তীব্র সমালোচনা করে রায়ে বলা হয়েছে, শুধু কাগজে-কলমে কিছু নীতিমালা তৈরি করে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সেই নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং একটি শক্ত জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত নিবন্ধিত হাসপাতাল, চিকিৎসালয় এবং রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলোর জন্য একটি সমন্বিত ও কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। এই সুবিশাল তথ্যভান্ডারে গর্ভবতী মায়েদের গর্ভের ভ্রূণ সংক্রান্ত সব ধরনের পরীক্ষামূলক প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে তা প্রতিনিয়ত তদারকি করতে হবে। দেশের যেকোনো প্রান্তে কোনো অনিয়ম হলে বা বেআইনিভাবে লিঙ্গ প্রকাশ করা হলে এই তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে তা খুব সহজেই দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনাগত শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ অত্যন্ত কঠোর আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রায়ে সেই দৃষ্টান্তটিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। আদালতের এই নির্দেশনাগুলো যাতে সময়ের সঙ্গে হারিয়ে না যায় বা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো যাতে কোনো ধরনের গাফিলতি করতে না পারে, সেজন্য আদালত এই রায়কে 'অব্যাহত আইনি আদেশ' (আইনের ভাষায় যাকে কন্টিনিউয়াস ম্যান্ডামাস বলা হয়) হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর সহজ অর্থ হলো, রায় ঘোষণার মাধ্যমেই এই মামলার কার্যক্রম চূড়ান্তভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে না; বরং নির্দেশনার কতটুকু এবং কীভাবে বাস্তবায়ন হলো, তা আদালত নিয়মিতভাবে নিবিড় তদারকি করবেন।
প্রসঙ্গত, সমাজে জেঁকে বসা লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে এবং পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় থাকা অনাগত কন্যাশিশুদের জীবনের অধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান ২০২০ সালের ছাব্বিশে জানুয়ারি এই জনস্বার্থের আইনি আবেদনটি দায়ের করেছিলেন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে শুনানির সময় তার সঙ্গে সহযোগী হিসেবে ছিলেন আরেক আইনজীবী তানজিলা রহমান। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে এই মামলার শুনানিতে জোরালো অংশগ্রহণ করেছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী প্রধান আইন কর্মকর্তা অমিত দাশ গুপ্ত। তাদের সকলের দীর্ঘ আইনি যুক্তিতর্কের ভিত্তিতেই আজকের এই ঐতিহাসিক রায়টি এমন পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল।
উচ্চ আদালতের এই যুগান্তকারী রায় নিঃসন্দেহে দেশের নারী অধিকার ও শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। 'কন্যাশিশু মানেই পরিবারের জন্য বোঝা'—সমাজের এই চরম পশ্চাৎপদ ও অন্ধকার চিন্তাধারা বদলাতে আইনি বাধ্যবাধকতার কোনো বিকল্প ছিল না। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধু আদালতের রায় দিয়ে বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যভান্ডার তৈরি করেই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা এই মানসিক ব্যাধি সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব নয়। পরিবার ও সমাজকে সবার আগে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকদেরও তাদের পেশাদারি নৈতিকতার সর্বোচ্চ পরিচয় দিতে হবে। একটি শিশু ছেলে নাকি মেয়ে হয়ে জন্ম নেবে, তার চেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত সে একটি সুস্থ মানবসন্তান। আসুন, আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এমন একটি মানবিক সমাজ গড়ি, যেখানে অনাগত প্রতিটি প্রাণ, তা কন্যা হোক বা পুত্র, সমান আনন্দ ও পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে পৃথিবীর আলো দেখতে পায়।