বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে বড় ধরনের আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছে সরকার। চলতি এপ্রিল মাস শেষ হওয়ার আগেই বিদেশ থেকে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেন দেশে এসে পৌঁছাবে বলে সংসদকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারের প্রস্তুতির কথা জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শওকতুল ইসলামের আনীত একটি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের (সংসদীয় কার্যপ্রণালির একটি বিশেষ নিয়ম, যার মাধ্যমে সমসাময়িক কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়) জবাবে মন্ত্রী এই তথ্য তুলে ধরেন।
মন্ত্রী জানান, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট থাকলেও বাংলাদেশে এর কোনো প্রভাব পড়তে দেবে না সরকার। তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, চলতি এপ্রিল মাসেই মোট ২ লাখ ৪৫ হাজার ৫৪৩ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশই হলো ডিজেল, যা দেশের কৃষি ও পরিবহন খাতের মূল চালিকাশক্তি।
জ্বালানি মজুতের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আগামী দিনের সরবরাহ চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন ডিজেল মজুত রয়েছে। তবে এই মজুত নিয়ে বসে নেই সরকার। আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আরও ১ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল দেশে পৌঁছাবে। ফলে সেচ মৌসুম ও পণ্যবাহী পরিবহনের জন্য ডিজেলের কোনো ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে।
একইভাবে ব্যক্তিগত ও হালকা যানবাহনে ব্যবহৃত অকটেনের বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে সরকারি ভাণ্ডারে ১০ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন অকটেন মজুত আছে। তবে দ্রুতই এই মজুত বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, কারণ মাসের শেষ নাগাদ আরও ৭১ হাজার ৫৪৩ মেট্রিক টন অকটেন আমদানির সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, পেট্রোলের মজুত বর্তমানে ১৬ হাজার মেট্রিক টন থাকলেও এপ্রিলের মধ্যেই আরও ৩৬ হাজার মেট্রিক টন পেট্রোল সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক দেশেই জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক জায়গায় তেলের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে তেমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হতে দেওয়া হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে আমদানির ঋণপত্র (বিদেশি বিক্রেতাকে মূল্য পরিশোধের ব্যাংক গ্যারান্টি) খোলার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে যাতে কোনোভাবেই সরবরাহের শিকল ছিঁড়ে না যায়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে যাতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে। বিশেষ করে বর্তমানে কৃষি জমিতে পানি দেওয়ার জন্য ডিজেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কৃষকরা যাতে সময়মতো ও নির্ধারিত মূল্যে তেল পান, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে বলে সংসদকে জানানো হয়।
জ্বালানি তেল একটি দেশের অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালনের মতো। বিশেষ করে ডিজেল ও পেট্রোলের সরবরাহ যদি সামান্যতম বিঘ্নিত হয়, তবে এর প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। মন্ত্রী যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন, তা আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তিদায়ক। তবে শুধু আমদানি করলেই হবে না, আমদানিকৃত এই তেলের সুষম বণ্টন এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধে স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারের ওপর আমাদের এই অতিনির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে বিপদ ডেকে আনতে পারে কি না, তা নিয়েও নীতিনির্ধারকদের ভাবার সময় এসেছে। দেশের অভ্যন্তরে নিজস্ব গ্যাস ও জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা গেলে হয়তো বিদেশের দিকে এমন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে হতো না।