দেড় মাস ধরে চলা তীব্র জ্বালানি সংকটে রাজধানীসহ সারা দেশের জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। পাম্পগুলোতে তেলের জন্য ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের দাবি করা হলেও বাস্তবে তেল পেতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা আর হাহাকার এখন নিত্যদিনের চিত্র।
গত শুক্রবার ছুটির দিনেও রাজধানীর রাজপথের চিত্র ছিল অন্যরকম। ভোর থেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল আর গণপরিবহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের (জ্বালানি তেল বিক্রয় কেন্দ্র) সামনে। খিলক্ষেত এলাকার একটি পাম্পের লাইন দীর্ঘায়িত হয়ে বনানীর হোটেল রেডিসন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অনেক চালক বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে রাতভর পাম্পের সামনেই অবস্থান করেছেন, তবুও শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দেখা পাননি। মৎস্য ভবন সংলগ্ন রমনা পাম্পে অপেক্ষমাণ এক ভুক্তভোগী জানান, ১০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও তিনি তেলের নাগাল পাননি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে অধিকাংশ পাম্পে ‘রেশনিং’ (একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল বরাদ্দ করা) পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। অর্থাৎ চাইলেই এখন আর ট্যাংক পূর্ণ করে তেল নেওয়া যাচ্ছে না। প্রতিটি গাড়ির জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তবুও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাম্পের সরবরাহ শেষ হয়ে যাচ্ছে, ফলে মুহূর্তেই পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহে অস্বাভাবিক বিলম্বই এই পরিস্থিতির মূল কারণ বলে মনে করছেন পাম্প কর্মীরা।
রাজধানীর বাইরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। নগরের অধিকাংশ পাম্পে অকটেন ও পেট্রোলের সরবরাহ না থাকায় সেগুলো বন্ধ রাখতে হয়েছে। সিলেটে প্রতিটি পাম্পে দৈনিক মাত্র ২০০০ লিটার তেল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। উত্তরের জেলা বগুড়াতেও এই সংকট সরাসরি কৃষিখাতে আঘাত হেনেছে। চলতি বোরো মৌসুমে সেচ কাজের জন্য ডিজেল না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। নাটোরে তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকরা মহাসড়ক অবরোধ করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
এই সংকটের মধ্যেই ভিন্ন দাবি করেছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি (দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার) পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেল আসতে কিছুটা বিলম্ব হলেও পরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে সরকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। চলতি মাসের শেষের দিকে নতুন তেলের জাহাজ দেশে পৌঁছালে উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে, রাজপথে জরুরি দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় পুলিশ সদস্যদের জন্য পাম্পগুলোতে আলাদা লাইনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও প্রভাবশালীরা ক্ষমতার জোরে আগে তেল নিয়ে যাচ্ছেন, যা প্রায়ই পাম্পগুলোতে হট্টগোল ও উত্তেজনার সৃষ্টি করছে।
জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকার সরকারি দাবি এবং মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের চরম হাহাকার—এই দুইয়ের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদি মজুত সত্যিই পর্যাপ্ত থাকে, তবে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোথায় ত্রুটি রয়েছে তা দ্রুত খুঁজে বের করা জরুরি। অন্যথায়, এই সংকট কেবল যাতায়াত ব্যবস্থায় নয়, বরং কৃষি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক অপূরণীয় ধস নামিয়ে আনতে পারে।