টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো বিশ্ববাজারে সোনার দামে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ফেডারেল রিজার্ভ) কঠোর নীতিগত অবস্থানের কারণেই মূলত মূল্যবান এই ধাতুটির বাজার এখন নিম্নমুখী। শুক্রবার (১৯ জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যার প্রভাব খুব শিগগিরই বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারেও পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার তাৎক্ষণিক বাজারে (স্পট মার্কেট) সোনার দাম কমে আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ১৮৯ দশমিক ২৬ ডলারে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে আগামী আগস্ট মাসে সরবরাহের চুক্তিতে থাকা মার্কিন সোনার আগাম লেনদেন বা ফিউচারসের (ভবিষ্যৎ চুক্তি) দামও কমে দাঁড়িয়েছে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ২০৭ দশমিক ৮০ ডলারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের মান গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় অন্যান্য মুদ্রায় সোনা কেনা এখন বেশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক কারণও সোনার দরপতনের অন্যতম নিয়ামক। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় তেলবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করেছে। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার আবেদন কিছুটা কমেছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ সুদের হার ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের মধ্যে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে আগামী ডিসেম্বরে সুদের হার আরও বৃদ্ধির জোর সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণত ব্যাংকে সুদের হার বেশি থাকলে সোনা থেকে সরাসরি কোনো লভ্যাংশ না পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারান। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস চলতি বছরের শেষ নাগাদ সোনার সম্ভাব্য দামের লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার ৪০০ ডলার থেকে কমিয়ে ৪ হাজার ৯০০ ডলারে নামিয়ে এনেছে।
বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের বাজারেও। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) যেকোনো সময় দেশে সোনার দাম কমানোর ঘোষণা দিতে পারে। এর আগে, গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বাজুস দেশের বাজারে সোনার দাম সমন্বয় করেছে। নতুন নিয়মে প্রতি ভরি সোনার দামে ২ হাজার ৫০৮ টাকা মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সরাসরি যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ফলে ক্রেতাদের কাছ থেকে এখন আর আলাদা করে ভ্যাট নেওয়া যাবে না।
বাজুসের নির্ধারিত নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকায়। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ভরি ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। তবে ক্রেতাদের অলংকারের নিজস্ব ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট মজুরি পরিশোধ করতে হবে।
এদিকে, বিশ্ববাজারে শুধু সোনা নয়, অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও নিম্নমুখী। সর্বশেষ লেনদেনে রুপার দাম কমে প্রতি আউন্স ৬৫ দশমিক ৩২ ডলারে, প্লাটিনাম ১ হাজার ৬৮০ দশমিক ৮৭ ডলারে এবং প্যালাডিয়াম ১ হাজার ২৭২ ডলারে নেমে এসেছে।