দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে আবারও অস্থিরতার কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১২ টাকা বাড়ানোর আবদার তুলে বাজারে বোতলজাত তেলের সরবরাহ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে দেশের বড় বড় পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে করে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে নাভিশ্বাস উঠেছে এবং বাজারের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
বাজারে এখন সয়াবিন তেলের বোতল খুঁজে পাওয়া যেন সোনার হরিণ পাওয়ার সমান।
রাজধানীর সেগুনবাগিচা থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে ভোজ্যতেলের হাহাকার শুরু হয়েছে। সরেজমিনে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ মুদি দোকানেই বোতলজাত সয়াবিন তেলের তাক শূন্য পড়ে আছে। দু-একটি দোকানে পাঁচ লিটারের দু-একটি বোতল অবশিষ্ট থাকলেও এক বা দুই লিটারের বোতলের কোনো দেখা নেই। ক্রেতারা এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরছেন, কিন্তু তেল ছাড়াই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে অনেককে।
সাহেদা বেগম নামের এক গৃহিণী আক্ষেপ করে বলেন, পাঁচটি দোকান ঘুরেও এক লিটার তেল পাননি তিনি। ঘরে রান্নার তেল না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন তার মতো শত শত মানুষ।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা চাইলেও কোম্পানিগুলো থেকে তেল পাচ্ছেন না। অনেক আগে দেওয়া ফরমায়েশ (অর্ডার) অনুযায়ী মাল সরবরাহ করছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধিরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, দাম না বাড়লে নতুন করে কোনো তেল বাজারে ছাড়া হবে না। তারা পণ্যের ফরমায়েশ নেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছেন। মূলত সরকারকে চাপে ফেলে নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর একটি অপকৌশল হিসেবে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে বাজারে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরকার নির্ধারিত দাম ১৯৫ টাকা। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এটি বাড়িয়ে ২০৭ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। একইভাবে পাঁচ লিটারের বোতলের দাম বর্তমানের ৯৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে। এই দাম বাড়ানোর ফন্দি হিসেবেই সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বোতলজাত তেলের এই সংকটের সুযোগ নিচ্ছে খোলা তেলের বাজার। খোলা সয়াবিন তেলের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়ে লিটারপ্রতি ১৯৫ থেকে ২১০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। পাম তেলের দামও এক মাসের ব্যবধানে লিটারপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ইতিমধ্যে তেলের দাম বাড়ানোর একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্ববাজারের তেলের দাম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, বর্তমান বাজার মূল্যই যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। তাই এই মুহূর্তে দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে মনে করছে সরকার। আগামী রবিবার এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি জরুরি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) তথা ভোক্তা অধিকার রক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এই পরিস্থিতিকে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি পরিকল্পিত সিন্ডিকেট বা অসাধু চক্রের কারসাজি হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, যখনই কোনো পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে, তখনই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হয়। সরকার যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে এই সংকট আরও প্রকট হবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে ক্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাজার তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগ নিচ্ছে এই অসাধু ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে, তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে নারাজ। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে তারা লোকসান গুনছেন। তাই দাম সমন্বয় না করলে তাদের পক্ষে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও তাদের এই দাবির সঙ্গে সরকারি হিসাবের কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
খাদ্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের এই দৌরাত্ম্য নতুন কিছু নয়, তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোজ্যতেল নিয়ে এমন কারসাজি সাধারণ মানুষের ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়িক মুনাফার লোভে মানুষকে জিম্মি করা কেবল অনৈতিকই নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক অপরাধ। সরকার ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠ পর্যায়ে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে না আনলে এর প্রভাব অন্যান্য নিত্যপণ্যের ওপরও পড়বে, যা সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।