রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের ফুটফুটে শিশু রামিসা আক্তারকে পাশবিক নির্যাতনের পর মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। রোববার দুপুরে জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে মূল অভিযুক্ত পাষণ্ড সোহেল রানার পাশাপাশি আলামত গোপনের চেষ্টায় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও আসামি করা হয়েছে।
ঢাকার প্রধান মহানগর হাকিম (চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) আদালতে রোববার (২৪ মে) দুপুরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে এই চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করেন। একটি অবুঝ শিশুর প্রতি কতটা পৈশাচিক বর্বরতা চালানো হয়েছে, তার রোমহর্ষক বিবরণ উঠে এসেছে পুলিশের এই তদন্ত প্রতিবেদনে।
মামলার চূড়ান্ত এই অভিযোগপত্রে প্রধান আসামি হিসেবে রাখা হয়েছে সোহেল রানাকে। তার বিরুদ্ধেই মূলত শিশুটিকে তুলে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন ও শ্বাসরোধ করে হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে, জঘন্য এই অপরাধে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা, আলামত নষ্ট করার চেষ্টা এবং স্বামীকে পালিয়ে যেতে সরাসরি সাহায্য করার অভিযোগে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও সমানভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতার সহায়তায় স্বপ্নাকে আটক করা হলেও সোহেল কৌশলে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেপ্তারের পর আদালতে দাঁড়িয়ে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছিল অভিযুক্ত সোহেল।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই নির্মম ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১৯ মে (মঙ্গলবার) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। রাজধানীর একটি স্থানীয় বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী আট বছরের রামিসা আক্তার যখন খেলাধুলা করছিল, তখন সুকৌশলে ও জোরপূর্বক তাকে নিজেদের কক্ষে টেনে নিয়ে যায় প্রতিবেশী সোহেল রানা। তদন্তে জানা যায়, ওই সময় ঘরের ভেতর সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘুমাচ্ছিলেন।
শিশু রামিসা বিপদের আঁচ পেয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করলে পাষণ্ড সোহেল তার মুখ ওড়না দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলে। এরপর তাকে জোর করে স্নানঘরে (শৌচাগার) নিয়ে গিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালায়। নিজের এই ঘৃণ্য অপরাধ ধামাচাপা দিতে একপর্যায়ে শিশুটিকে অমানবিকভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সে। তবে তার নির্মমতা এখানেই থেমে থাকেনি। হত্যার পর আলামত নষ্ট ও লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশু রামিসার মাথা শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং খণ্ডিত অংশগুলো একটি বালতির ভেতর লুকিয়ে রাখে ঘাতক।
এদিকে, দীর্ঘক্ষণ আদরের মেয়েকে দেখতে না পেয়ে রামিসার পরিবার ও স্বজনেরা হন্যে হয়ে তাকে চারদিকে খুঁজতে থাকেন। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হলে তারা সোহেল রানার ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরের হট্টগোলে ঘুম ভাঙে স্ত্রী স্বপ্নার। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানান এবং স্থানীয়দের ভেতরে ঢুকতে বাধা দিয়ে কালক্ষেপণ করেন। মূলত এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই সোহেল রানা ঘরের জানালার লোহার গরাদ ভেঙে পেছনের দিক দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরে স্থানীয়রা জোরপূর্বক ঘরের ভেতর প্রবেশ করে স্বপ্নাকে আটকে রাখেন এবং পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে স্নানঘর থেকে শিশু রামিসার খণ্ডিত ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর রামিসার পরিবারে নেমে আসে শোকের কালো ছায়া। আদরের সন্তানকে এমন বীভৎস অবস্থায় দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তার মা-বাবা। এই ঘটনায় পুরো পল্লবী এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে নিহত শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে রাজধানীর পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদন সংগ্রহ করে আদালতে এই চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করল।
শিশু রামিসার এই মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের সমাজের এক গভীর নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্রই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। নিজ বাড়ির আঙিনায় বা পরিচিত প্রতিবেশীর কাছেও যদি একটি আট বছরের শিশু নিরাপদ না থাকে, তবে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তি আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? এই প্রশ্ন আজ প্রতিটি বিবেকবান মানুষের মনে। দ্রুততম সময়ে পুলিশ অভিযোগপত্র দাখিল করে প্রশংসনীয় কাজ করেছে ঠিকই, কিন্তু এখন প্রয়োজন বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি, সমাজে ঘাপটি মেরে থাকা এমন বিকৃত মানসিকতার বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তা না হলে হয়তো আগামীতেও আরও অনেক অবুঝ প্রাণকে এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হবে।