রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুরে এই হত্যাকাণ্ডের পর বুধবার তাকে আদালতে হাজির করলে তিনি বর্ণনা করেন কীভাবে সে শিশুটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে সোহেল রানা নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান অভিযুক্ত সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে হাজির করেন। শুনানি শেষে বিচারক সোহেল রানাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে অন্য মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক অপর আসামি স্বপ্নার বিষয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার সকালে। পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিল। স্বজনদের দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে তাদের বাড়ির তৃতীয় তলায় সাবলেট ভাড়াটে সোহেলের কক্ষের সামনে রামিসার স্যান্ডেল দেখতে পান তার মা। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই বেরিয়ে আসে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য। পুলিশ জানায়, সোহেল রানা শিশুটিকে কৌশলে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালায় এবং পরবর্তীতে গলা কেটে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সোহেল রানা হত্যাকাণ্ডের পর মৃতদেহ গুম করার চেষ্টা করে। সে রামিসার দেহ থেকে মাথা আলাদা করে তা বাথরুমের বালতির ভেতরে রেখেছিল। এছাড়া দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ-বিচ্ছিন্ন অবস্থায় খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে রামিসার মা ও অন্যান্যদের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে এবং সেই মুহূর্তেই ঘাতকের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করে।
পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঘটনার সময় ঘরে উপস্থিত থাকা স্বপ্না আক্তার পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, সোহেল রানাই এককভাবে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর সোহেল জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু তার আগেই পুলিশ ও এলাকাবাসীর তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ঘটনার দিনই পল্লবী থানায় সোহেল ও স্বপ্নার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
এই লোমহর্ষক ঘটনাটি পুরো এলাকার মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। আট বছরের একটি নিষ্পাপ শিশুকে এমন নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
শিশু রামিসা হত্যার ঘটনাটি আবারও আমাদের সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিক অবক্ষয়ের দিকে আঙুল তুলছে। পরিচিত মানুষের দ্বারা এমন নৃশংসতার শিকার হওয়াটা গভীর উদ্বেগের বিষয়। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আমাদের পাড়া-মহল্লায় বসবাসকারী অপরিচিত বা নতুন ভাড়াটেদের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এছাড়া পারিবারিক ও সামাজিক নজরদারি না থাকলে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ক্রমশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন, যাতে অপরাধী কোনোভাবেই পার না পায়।