রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পুরো দেশ স্তম্ভিত। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে রাজধানীর পল্লবীতে ঘটে যাওয়া এই লোমহর্ষক ঘটনাটি বিবেকবান প্রতিটি মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে নয়টার দিকে শিশু রামিসা বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর স্বপ্না নামের এক প্রতিবেশী কৌশলে তাকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে দশটার দিকে স্কুলগামী মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে তার মা অস্থির হয়ে ওঠেন। এক পর্যায়ে প্রতিবেশী স্বপ্নার ঘরের সামনে রামিসার জুতা পড়ে থাকতে দেখে তার সন্দেহ হয়।
শিশুটির অভিভাবক ও প্রতিবেশীরা ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে বাধ্য হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে যা দেখেন, তা ছিল এক বিভীষিকাময় দৃশ্য। শয়নকক্ষের মেঝেতে পড়ে ছিল রামিসার মস্তকবিহীন দেহ, আর মাথাটি রাখা ছিল ঘরের ভেতরে থাকা একটি বড় বালতির ভেতর। ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্বপ্নাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে দাবি করে, তার স্বামী সোহেল রানা বাথরুমে আটকে রেখে শিশুটিকে ধর্ষণ করেছে এবং গলা কেটে হত্যা করেছে। এমনকি হত্যার পর মরদেহ গুম করার জন্য সোহেল রামিসার দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক আলাদা করে ফেলে। এরপর জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যায় বলে স্বপ্না দাবি করে।
এই ঘটনায় শিশু রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার পাশাপাশি অজ্ঞাত আরও একজনকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই পুলিশ স্বপ্নাকে আটক করে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত অভিযানে নামে পুলিশ এবং সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত সূত্রে জানা গেছে, সোহেল রানা ইতোমধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তার অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে সম্মত হয়েছে। তবে মামলায় অভিযুক্ত অজ্ঞাত ব্যক্তিটি এখনো পলাতক রয়েছে, তাকে ধরতে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত আছে।
পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে তার পরিবার শোকে পাথর হয়ে গেছে। রামিসার বাবা ক্ষোভ ও কান্নার সুরে জানান, তাদের আর কোনো চাওয়া নেই, শুধু হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই একমাত্র কাম্য। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার পর রামিসার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বুধবার রাতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের ইছাপুরের পৈতৃক ভিটায় জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থায় এমন অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) প্রদান এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করার জন্য সব ধরনের আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পল্লবীর এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সমাজে বেড়ে চলা চরম অবক্ষয় ও নিরাপত্তার অভাবকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ঘরের পাশের প্রতিবেশী যদি এমন ভয়াবহ দানবীয় রূপ ধারণ করে, তবে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অভিভাবক ও সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আইনের দীর্ঘসূত্রতা যেন এমন অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ করে না দেয়—সেটিই এখন নাগরিক সমাজের প্রধান দাবি। দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে ভবিষ্যতে এমন জঘন্য ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে।