ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে যখন সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় মসলা কিনতে বাজারে ছুটছেন, ঠিক তখনই আদার বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, সরবরাহ ঘাটতি থাকলেও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে—এটি স্পষ্টত একটি পরিকল্পিত সিন্ডিকেটের কারসাজি।
দেশের অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাত্র দুই সপ্তাহ আগে যে চায়না আদা ৯৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, তা এখন প্রতি কেজি দুইশ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। খুচরা বাজারে এই দাম আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত সোমবার থেকে আদার দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করে এবং মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে তা ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
আদার এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে কেরালা জাতের আদা আমদানিতে স্থবিরতাকে দায়ী করছেন। তাদের ভাষ্যমতে, বাজারে ভারতীয় আদা না আসায় পুরো চাহিদা চায়না আদার ওপর এসে পড়েছে। এছাড়া গত কয়েক মাস ধরে আমদানিকারকরা লোকসানে আদা বিক্রির ফলে অনেকেই নতুন করে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারেননি, যার ফলে বাজারে এখন সংকট দেখা দিয়েছে। ল্যামার বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস জানান, বর্তমানে যে আদা বাজারে আসছে তার আমদানি মূল্যই অনেক বেশি, ফলে কম দামে বিক্রির সুযোগ নেই।
তবে ব্যবসায়ীদের এই যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন ক্রেতা প্রতিনিধিরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন এই পরিস্থিতিকে ‘সিন্ডিকেট কারসাজি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে আদার দাম কেন দ্বিগুণ হবে? বন্দর দিয়ে নিয়মিত আদাভর্তি জাহাজ খালাস হলেও আমদানিকারকরা তা বাজারে ছাড়তে দেরি করছেন। তাদের এই কৃত্রিম সংকট তৈরির পেছনে অতি মুনাফালোভী একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা কোরবানির চাহিদাকে পুঁজি করে ফায়দা লুটছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিনে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রচুর আদাভর্তি কনটেইনার এসে পৌঁছেছে। অনেক বড় আমদানিকারকের পণ্য এখনো বন্দরের ইয়ার্ডে অলস পড়ে আছে। অথচ বাজারে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমদানিকারকরা অবশ্য নিজেদের লোকসানের কথা বলে এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, পচনশীল পণ্য হওয়ায় এবং হিমাগারে সংরক্ষণের অতিরিক্ত খরচের কারণে তারা দ্রুত পণ্য বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, খাতুনগঞ্জের বাজারে আদার কেজি ২০০ থেকে ২১০ টাকায় ঠেকেছে। ব্যবসায়ীরা আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে বলছেন, সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে কোরবানির আগমুহূর্তে এই দাম আরও বাড়তে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই আকাশচুম্বী দামে মসলা কিনতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত বাজারে কার্যকর কোনো তদারকি বা অভিযান চোখে পড়েনি, যা সিন্ডিকেটকে আরও সাহসী করে তুলছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর বড় উৎসব। এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা জরুরি। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে একটি চক্র উৎসবের মৌসুমকে পুঁজি করে সিন্ডিকেট ব্যবসা চালিয়ে আসছে। আদার ক্ষেত্রেও সেই একই চিত্র ফুটে উঠেছে। কেবল ব্যবসায়ীদের ওপর দায় চাপিয়ে বা তাদের দোহাই দিয়ে এই অস্থিতিশীল বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে বন্দরে আটকে থাকা পণ্য খালাস নিশ্চিত করা এবং বাজারে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে কোরবানির আগে বাজার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থেকে যাবে।