নেতৃত্ব সংকটে ধুঁকতে থাকা দেশের বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক'-এর শীর্ষ দুই পদে নতুন মুখ নিয়ে আসা হয়েছে। ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন কাজী শায়রুল হাসান এবং নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আবেদুর রহমানকে। সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে পৃথক দুটি চিঠির মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
আর্থিক খাতের ধারাবাহিক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় থাকা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য এই নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান এর আগে বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (একাধিক দেশের যৌথ মালিকানায় বা পরিচালনায় থাকা অর্থলগ্নী সংস্থা) সৌদি-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি বা সাবিনকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান বেসরকারি খাতের অন্যতম বৃহৎ ডাচ-বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের গুরুদায়িত্ব সফলভাবে সামলে এসেছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা এই নিয়োগের বিষয়ে জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনাপত্তি পত্র (কোনো ব্যক্তির নিয়োগ বা কার্যক্রমে আপত্তি না থাকার আইনি প্রমাণপত্র) গ্রহণ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবুজ সংকেত পেলেই তারা নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে পারবেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের আর্থিক খাতে চরম সংকটে পড়া পাঁচটি বেসরকারি শরিয়াহভিত্তিক (ইসলামী শরিয়ত ও সুদমুক্ত নীতি অনুযায়ী পরিচালিত) ব্যাংককে একত্রিত করে এই নতুন ব্যাংকটি গঠন করা হয়েছিল। একীভূত হওয়া সেই পাঁচটি ব্যাংক হলো— এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। দেশের ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে এই একীভূতকরণ (একাধিক দুর্বল বা সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানকে একসাথে মিলিয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স বা ব্যবসায়িক অনুমোদনপত্র জারি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সরকারের সাবেক সচিব মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াকে। তবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে প্রথমে যার নাম চূড়ান্ত করা হয়েছিল, তিনি শেষ পর্যন্ত এই পদে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে শুরু থেকেই ব্যাংকটিতে এক ধরনের নেতৃত্ব সংকট ও সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হয়েছিল।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল ঘটে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে আসেন মোস্তাকুর রহমান। এর কিছুদিন পর, গত ১৬ মার্চ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া। তার পদত্যাগের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো স্থায়ী চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছাড়াই চলছিল ব্যাংকটির যাবতীয় কার্যক্রম, যার ফলে গ্রাহকসেবা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছিল।
পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে দেশের অন্যতম একটি আস্থাশীল ও শক্তিশালী ব্যাংকে রূপান্তর করা নতুন নেতৃত্বের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ পদের শূন্যতা এবং পূর্ববর্তী নেতৃত্বের অনুপস্থিতি ব্যাংকটির প্রতি সাধারণ গ্রাহকদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছিল। নতুন চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংকটির আমানতকারীদের মনে নিরাপত্তা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং অনাদায়ী বড় অংকের ঋণ আদায় করা। কেবল কাগজ-কলমে একীভূতকরণই কোনো ব্যাংকের সংকট কাটাতে পারে না, যদি না দক্ষ নেতৃত্ব ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়। নবনিযুক্ত এই দুই অভিজ্ঞ ব্যাংকার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে কতটা সঠিক পথে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, তা দেখার জন্য আমাদের গভীর নজর রাখতে হবে।