আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মাঝেও দেশের বাজারে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সাধারণ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপের কথা বিবেচনা করে এপ্রিল মাসেও গত মার্চ মাসের নির্ধারিত মূল্যেই জ্বালানি তেল বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা দরেই বিক্রি হবে।
উল্লেখ্য যে, গত ১ ফেব্রুয়ারি সরকার জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২ টাকা কমিয়েছিল। সেই হিসেবে তখন থেকে ডিজেল ১০২ টাকা থেকে কমে ১০০ টাকা এবং অকটেন ১২২ টাকা থেকে ১২০ টাকা করা হয়েছিল। এছাড়া পেট্রোল ১১৮ টাকা থেকে ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১৪ টাকা থেকে ১১২ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। মার্চ মাসেও সেই একই দাম বহাল ছিল এবং এপ্রিলের জন্যও সরকার পুরনো দামেই স্থির থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমা-বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে 'জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা' অনুসরণ করা হচ্ছে। এই বিশেষ নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতি মাসেই জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তবে এপ্রিল মাসের জন্য বাজার বিশ্লেষণ করে সরকার দাম না বাড়ানোর পক্ষেই মত দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের চলমান উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল পরিবহনের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ (পারস্য উপসাগরের প্রবেশপথ) আংশিক বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে গত জানুয়ারি মাস থেকেই তেলের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে গত কয়েক দিন ধরে জ্বালানি তেলের সংকটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের অপেক্ষায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন যে, পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
কিছু মানুষ তেলের দাম বাড়বে এমন গুজব ছড়িয়ে আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন, যা সাময়িক সংকট তৈরি করছে।
অন্যদিকে, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ভবিষ্যতে বেশি মুনাফার আশায় অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে মজুত করা বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হচ্ছে। সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, আপাতত তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। যারা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের খরচ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। তবে তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে কেন সংকট দেখা দিচ্ছে, তা সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না। বৈশ্বিক এই পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ীভাবে জ্বালানি ব্যবহারের পাশাপাশি চোরাচালান ও অবৈধ মজুত বন্ধে জনগণের সচেতনতা ও প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।