দেশে চলমান জ্বালানি সাশ্রয় প্রচেষ্টার মাঝে সাধারণ ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে সরকার। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পূর্বে ঘোষিত সময়সীমা পরিবর্তন করে এখন থেকে দেশের সব বড় বাজার ও দোকানপাট সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘ সময় ধরে চলা বাণিজ্যিক স্থবিরতা কিছুটা কাটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রোববার (৫ এপ্রিল) দুপুরে এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি জানান, দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি এবং পবিত্র রমজান ও ঈদ সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আসা জোরালো দাবির প্রেক্ষিতে এই সময়সীমা এক ঘণ্টা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে রাত নামার আগেই অর্থাৎ সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সব বিপণি বিতান বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সময়সীমা শিথিল করা হয়েছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তিনি আগামী তিন মাসের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল (পেট্রোল ও অকটেন) অগ্রিম সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বর্তমান মজুদ পরিস্থিতি সম্পর্কে আশ্বস্ত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এপ্রিল মাসে দেশে তেলের যে চাহিদা রয়েছে, তা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত তেল সরকারের ভাণ্ডারে মজুদ রয়েছে। এছাড়া তিন মাসের আপৎকালীন মজুদ গড়ে তোলার প্রক্রিয়াও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
বৈশ্বিক রাজনীতি ও জ্বালানি আমদানির বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী একটি আশাব্যঞ্জক তথ্য দেন। তিনি জানান, সরকার রাশিয়ার কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী মূল্যে তেল আমদানির বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সাথে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বৈঠকে রাশিয়ার ওপর থাকা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা (বাণিজ্যিক অবরোধ) শিথিল করার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বিশেষ ছাড় (নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি) দিতে পারে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। এটি সম্ভব হলে দেশের জ্বালানি সংকট অনেকাংশেই দূর হবে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্যের ওপর।
উল্লেখ্য যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে অনেক উন্নত দেশও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সংকটের বাইরে নয়। তবে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে সরকার ধাপে ধাপে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল আমদানির বেশ কিছু নতুন উৎস খুঁজে পাওয়া গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির নেতারা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা ইতিপূর্বে রাত ৮টা পর্যন্ত ব্যবসা করার সুযোগ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। যদিও সরকার আপাতত ৭টা পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করেছে, তবুও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন এই এক ঘণ্টার বাড়তি সময় তাদের কেনাবেচায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে অফিস শেষে যারা কেনাকাটা করতে বের হন, তাদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। সরকার ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং আগামীতে প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত আরও সমন্বয় করা হতে পারে।
জ্বালানি সাশ্রয় এবং অর্থনৈতিক সচলতা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যেকোনো সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সময় বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি একদিকে যেমন কিছুটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের একদম পথে বসে যাওয়া থেকেও রক্ষা করবে। তবে কেবল সময় বেঁধে দিয়েই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানির যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথা বলা হচ্ছে, তা সফল হলে দেশের পরিবহন ও শিল্প খাতে বড় ধরনের স্থিতি আসবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের উচিত অপচয় কমিয়ে সরকারের এই বিশেষ ব্যবস্থাকে সহযোগিতা করা, যাতে আমরা সবাই মিলে এই বৈশ্বিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারি।