পবিত্র রমজান ও আসন্ন ঈদ-উল-ফিতরের আমেজ চলাকালেই সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের বাজেটে বড় ধরনের ধাক্কা দিল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির নতুন মূল্য তালিকা। আমদানিকৃত এই জ্বালানির দাম এক লাফে এতটাই বেড়েছে যে, ১২ কেজি ওজনের একটি সিলিন্ডার কিনতে এখন গ্রাহককে আগের চেয়ে প্রায় চারশ টাকা বেশি গুনতে হবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আজ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এপ্রিল মাসের জন্য এই নতুন দাম ঘোষণা করেছে। সংস্থার চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারেও এই সমন্বয় অনিবার্য হয়ে পড়েছে। আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকেই সারা দেশে নতুন এই দাম কার্যকর হবে।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। এপ্রিল মাসে ৩৮৭ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে এর নতুন দাম নির্ধারিত হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি এলপিজির মূল্য এখন ১৪৪ টাকা ৪ পয়সা। অথচ মাত্র এক মাস আগে ফেব্রুয়ারি মাসে শুল্ক কমানোর ফলে গ্রাহকরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন, যখন দাম ১৫ টাকা কমানো হয়েছিল। এক মাসের ব্যবধানে সেই স্বস্তি এখন চরম উদ্বেগে রূপ নিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শুধু গৃহস্থালির গ্যাসই নয়, যানবাহনে ব্যবহৃত অটো গ্যাসের দামও লিটার প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রতি লিটার অটো গ্যাসের দাম ৬১ টাকা ৮৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা করা হয়েছে। তবে সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা সাড়ে ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডারের দাম আগের মতোই ৮২৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষ সরকারি সিলিন্ডার বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে না পাওয়ায় এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন সাধারণত সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান ‘আরামকো’ থেকে আমদানি করা হয়। এই দুই উপাদানের আন্তর্জাতিক মূল্য যা ‘সৌদি কার্গো মূল্য’ বা সিপি নামে পরিচিত, তার ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশে প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করা হয়। বিইআরসি জানিয়েছে, চলতি মাসে সৌদি সিপির ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণেই স্থানীয় বাজারে এই আকাশচুম্বী দাম নির্ধারণ করতে হয়েছে।
এদিকে সাধারণ ভোক্তাদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে দাম যা-ই হোক না কেন, খুচরা বাজারে কখনোই নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পাওয়া যায় না। বিক্রেতারা প্রায়ই সিন্ডিকেট (ব্যবসায়ীদের গোপন জোট) তৈরি করে সিলিন্ডার প্রতি বাড়তি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। নতুন করে দাম বাড়ার ফলে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার না করলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছাবে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, মো. আব্দুর রাজ্জাকসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে এলপিজির দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বাড়ানো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে এক নতুন সংকটে ফেলল। বিশেষ করে যখন চাল, ডালসহ নিত্যপণ্যের দাম আগে থেকেই চড়া, তখন জ্বালানি খরচের এই বোঝা প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। বিইআরসি দাম নির্ধারণ করলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। খুচরা বিক্রেতাদের স্বেচ্ছাচারিতা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করার প্রবণতা রোধ করা না গেলে সরকারের এই দাম সমন্বয়ের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না। যথাযথ তদারকি ও বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সরকারি গ্যাস সরবরাহের পরিধি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।