বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াচ্ছে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি)। সরকারের পরিকল্পিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও বাজেট বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। এই বৈঠকে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং সংকটকালীন সহায়তার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এআইআইবির এই ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা জানান।
অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপরেও পড়েছে। এই বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এআইআইবি বাংলাদেশকে বড় ধরনের ‘বাজেট সহায়তা’ (সরকারের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটাতে সরাসরি আর্থিক সহযোগিতা) দিতে সম্মত হয়েছে। এই সহায়তার একটি বড় অংশ ব্যয় হবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রকল্পগুলোতে। বিশেষ করে যারা পরিবেশের ক্ষতি না করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায়, তাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে এই সংস্থাটি।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সনাতন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে বিকল্প জ্বালানির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মোট চাহিদার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। পরিবেশবান্ধব এই রূপান্তর কেবল বিদ্যুৎ সংকটই মেটাবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করবে। এর পাশাপাশি দেশে ‘ইলেকট্রিক ভেহিকল’ বা বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতের প্রসারেও অর্থায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে, যা পরিবহন খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের শিল্প খাতের পুনর্জাগরণ এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূর করতে সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরোনো মিল-কারখানাগুলো পুনরায় সচল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে কেবল ঝিমিয়ে পড়া উৎপাদন খাত চাঙ্গা হবে না, বরং অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পুরোনো কিন্তু সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলো সচল করার মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও শ্রমশক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশীয় সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর সহায়তার সমন্বয়ে বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে আসন্ন বাজেটের আকার কিংবা জ্বালানির দামের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এখনই কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেননি তিনি। তিনি মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং সঠিক বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে চলমান জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট দ্রুতই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এআইআইবির এই সহায়তার আশ্বাস বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে শুধু বিদেশি ঋণ বা সহায়তার ওপর নির্ভর না করে, সৌর বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। এছাড়া বন্ধ কারখানাগুলো চালু করার পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে তা তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে। সরকারের এই উদ্যোগগুলো কতটা দ্রুত এবং স্বচ্ছতার সাথে কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের আগামীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।