মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের বাজারে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম লিটারে সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস তুলছে। জ্বালানি সংকট ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতা আর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে। বিশেষ করে ভোজ্যতেলের বাজারে গত দুই দিনে যে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে। অথচ সরকারি হিসেবে তেলের দাম অনেক কম নির্ধারিত থাকলেও বাজারে তার কোনো প্রতিফলন নেই।
দুই দিন আগেও রাজধানীর বাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু গতকাল সেই একই তেল বিক্রি হতে দেখা গেছে ১৯০ থেকে ১৯২ টাকা দরে। অর্থাৎ লিটারপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৭ থেকে ১০ টাকা। একইভাবে পাম অয়েলের দামও ১৭৫ টাকা থেকে লাফিয়ে ১৮৫ টাকায় পৌঁছেছে। সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম অনুযায়ী প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ১৭৬ টাকা এবং পাম তেল ১৬৬ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ক্রেতাদের লিটারপ্রতি ১৪ থেকে ১৯ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। বোতলজাত সয়াবিনের দাম গায়ের রেটের কারণে আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও অনেক জায়গায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দাম রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ব্যবসায়ীরা এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে দায়ী করছেন। পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, মিলগেট থেকে তেল কিনতেই এখন ড্রামপ্রতি (২০৪ লিটার) প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েল কেন্দ্রিক উত্তেজনার ফলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
তেলের পাশাপাশি সবজির বাজারেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। ডিজেল স্বল্পতার অজুহাতে ট্রাক ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় সব ধরণের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে পটল, ঢ্যাঁড়শ ও বেগুনের মতো নিত্যদিনের সবজিগুলোর দামও ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে মিলছে না। উচ্ছে বা করলার দাম তো আকাশচুম্বী, যা প্রতি কেজি ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
তবে বাজারের এই ঊর্ধ্বগতির মাঝে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে মুরগি ও ডিমের দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ৩০ টাকা কমে ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায় নেমে এসেছে। ডিমের ডজনও এখন ১১০ টাকার আশেপাশে পাওয়া যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য এটি সামান্য স্বস্তি দিলেও ভোজ্যতেল ও সবজির দামের ভারে সেই স্বস্তি ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
বাজারের এই আকস্মিক অস্থিরতা প্রমাণ করে যে, বিশ্ববাজারের সামান্য অজুহাতে আমাদের স্থানীয় বাজার কত দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। যদিও জ্বালানি তেলের দাম দেশে সরকার বাড়ায়নি, তবুও সরবরাহ সংকটের দোহাই দিয়ে পরিবহন ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর না করে অভ্যন্তরীণ বাজার তদারকি জোরদার করা এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো দুরুহ হয়ে পড়বে।